ঋণখেলাপি ও পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণেই এনসিসি ব্যাংক!

0
523

বিশেষ প্রতিনিধি:

বেসরকারি এনসিসি ব্যাংক পিএলসির নবগঠিত কমিটি নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ব্যাংকের ভবিষৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন শেয়ারহোল্ডারগণ অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিতর্কিত নতুন ব্যবস্থাপনা বোর্ড আগামী ৭ জানুয়ারি এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিং-ইজিএম ডেকেছে। যেখানে পাবলিক শেয়ারহোল্ডারদের ডিরেক্টর হওয়ার বিধান বাতিলের এজেন্ডা রাখা হয়েছে। যা ব্যাংকিং সুশাসনের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন শেয়ারহোল্ডারসহ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম। এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
ছবি: সংগৃহিত

যেখানে পাবলিক শেয়ারহোল্ডারদের ডিরেক্টর হওয়ার বিধান বাতিলের এজেন্ডা রাখা হয়েছে। যা ব্যাংকিং সুশাসনের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন শেয়ারহোল্ডারসহ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

মাইন উদ্দিন মোনেম। এনসিসি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান।
ছবি: সংগৃহিত

শেয়ারহোল্ডার ও ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে-বেসরকারি NCC ব্যাংক PLC এর অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে সম্প্রতি জানতে পেরেছেন তারা। সূত্রে প্রকাশ-বোর্ডের কিছু সদস্য এবং প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এনসিসি ব্যাংকের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা যায়, এনসিসি ব্যাংকের ফরেন এক্রচেঞ্জ শাখার গ্রাহক রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুন নেওয়াজের অর্কিড এনার্জি লিমিটেড কোম্পানীর নামক এলপিজি স্থাপনা অধিগ্রহন বাবদ ২৬ কোটি টাকা ঋন প্রদানের আবেদন করেন। এর মাঝে ১৬ কোটি টাকা হলো টার্ম ঋন যেটি এলপিজি মেশিনারী,কারখানার জায়গা এবং কোম্পানীর গাড়ী অধিগ্রহনে ব্যবহৃত হবে যেটি আগামী ৮ বছরে পরিশোধযোগ্য। আর ১০ কোটি টাকা ঋন চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে আবেদন করা এই ঋন অনুমোদনের জন্য এনসিসি ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালক এবং বর্তমান চেয়ারম্যান মো: নুরুন নেওয়াজ নিজেদের পরিচয় গোপন করে এনসিসি ব্যাংকের ফরেন এক্রচেঞ্জ শাখায়  রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের নামে ঋন অধিগ্রহনের আবেদনটি করেন। যে অর্কিড এনার্জি লিমিটেড কোম্পানীর ঋন অধিগ্রহনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন সেই কোম্পানীটির মালিক হলেন মো: নূরুন নেওয়াজ নিজেই। এ কোম্পানীর অন্যান্য পরিচালকরা হলেন তার ছেলে মো: সাজ্জাদ নেওয়াজ এবং তার স্ত্রী শাহিদা নেওয়াজ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এ ঋন প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করা হয়। মো: নূরুন নেওয়াজ অর্কিড এনার্জি লিমিটেড’র মালিক হলেও তিনি তা সম্পূর্ন গোপন করেন। তথ্য গোপন করে নিজ ব্যাংক হতে অধিগ্রহনের নামে ঋন জালিয়াতির চেস্টা পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে চাঞ্চল্যের সৃস্টি করে। যা ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এর ধারার সম্পূর্ন লংঘন। মো: নুরুন নেওয়াজ নিজে পরিচালক হয়ে তড়িগড়ি করে অন্য কোম্পানীর ছদ্মাবরনে জালিয়াতির মাধ্যমে অধিগ্রহনের নামে নিজ কোম্পানীর কথা গোপন করে ঋন অনুমোদন করিয়ে নেয়ার চেস্টা ব্যাংক কোম্পানী আইনের সম্পূর্ন লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এনসিসি ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালক এবং বর্তমান চেয়ারম্যান মো: নুরুন নেওয়াজ নিজেদের পরিচয় গোপন করে এনসিসি ব্যাংকের ফরেন এক্রচেঞ্জ শাখায়  রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের নামে ঋন অধিগ্রহনের আবেদনটি করেন। যে অর্কিড এনার্জি লিমিটেড কোম্পানীর ঋন অধিগ্রহনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন সেই কোম্পানীটির মালিক হলেন মো: নূরুন নেওয়াজ নিজেই। এ কোম্পানীর অন্যান্য পরিচালকরা হলেন তার ছেলে মো: সাজ্জাদ নেওয়াজ এবং তার স্ত্রী শাহিদা নেওয়াজ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এ ঋন প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করা হয়। মো: নূরুন নেওয়াজ অর্কিড এনার্জি লিমিটেড’র মালিক হলেও তিনি তা সম্পূর্ন গোপন করেন। তথ্য গোপন করে নিজ ব্যাংক হতে অধিগ্রহনের নামে ঋন জালিয়াতির চেস্টা পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে চাঞ্চল্যের সৃস্টি করে।

খায়রুল আলম চাকলাদার। পরিচালক এনসিসি ব্যাংক

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, এ সংক্রান্ত প্রস্তাব গত ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২-এ অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় উত্থাপিত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট শাখার একজন হুইসেলব্লোয়ার প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য বোর্ড সদস্যের অযাচিত চাপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পরে তা স্থগিত করা হয়। এটি পরে আবারও ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২-এ আরেকটি বোর্ড সভায় উত্থাপনের জন্য রাখা হয়। এবং তা বোর্ডে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি একটি “প্রত্যাহার” হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছিল।

এই ঋণ প্রস্তাবে বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম, তার স্ত্রী শাহিদা নেওয়াজ ও ছেলে পরিচালক মোহাম্মদ সাজ্জাদ উন নেওয়াজ এবং খায়রুল আলম চাকলাদারসহ অন্যরা অবৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনের আড়ালে ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য এনসিসি ব্যাংককে ব্যবহারের অভিযোগ আছে।

নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, শেখ হাসিনার সাবেক কর্মকর্তা ফেনীর আলাউদ্দিন নাসিম ও তার ভাই এনসিসি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা পান্থপথ শাখার ম্যানেজার জালালের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে- নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, শেখ হাসিনার সাবেক কর্মকর্তা ফেনীর আলাউদ্দিন নাসিম ও তার ভাই এনসিসি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা পান্থপথ শাখার ম্যানেজার জালালের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন। ব্যাংকের কয়েকজন বোর্ড সদস্য জানান-বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে গত ২৮ অক্টোবর চেয়ারম্যান নির্বাচনে বোর্ড মিটিংয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের অফিস থেকে পত্র মারফত এক সপ্তাহের মধ্যে খায়রুল আলম চাকলাদার, আবদুস সালাম ও মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিমের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট পাঠাতে বলা হয়েছিল। সেই তদন্তকে পাশ কাটিয়ে মো: নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম গংরা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।

চেয়ারম্যান এর ছেলে এবং ব্যাংকের পরিচালক সাজ্জাদ উন নেওয়াজ ।

কয়েকজন পরিচালক জানিয়েছেন- গত ২৮ অক্টোবর ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচনী বোর্ড মিটিংয়ে কয়েকজন পরিচালক কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এ তদন্তের বিষয়টি এবং তদন্তে পাওয়া রিপোর্ট সম্পর্কে জানানো হয়নি তা জানতে চান। কিন্তু সে সময় নূরুন নেওয়াজের সকল অপকর্মের অন্যতম সঙ্গী খায়রুল আলম চাকলাদার অন্যান্য পরিচালকদের বিষয়টি বেশি না ঘাটাতে সবাইকে হুমকি দেন। বরং উক্ত বোর্ড মিটিংয়ে দুর্নীতির তদন্ত রিপোর্টকে পাশ কাটিয়ে নুরুন নেওয়াজ নিজেকে চেয়ারম্যান এবং দেশের অন্যতম প্রধান ঋন খেলাপী আব্দুল মোনেম কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইন উদ্দিন মোনেমকে ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। অথচ ব্যাংক কোম্পানী অনুসারে এদের কেউ পরিচালক থাকার যোগ্য নন।

এসব কর্মকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে এই প্রতারণামূলক কার্যকলাপের সাথে জড়িত যেকোন ব্যক্তিকে অপসারণের জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাংলাদশকে অবহিত করেছেন ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এসব অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনসিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো উত্তর দেননি তিনি। একই সঙ্গে মাইন উদ্দিন মোনেম ও খায়রুল আলম চাকলাদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তারা।

এসব কর্মকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে এই প্রতারণামূলক কার্যকলাপের সাথে জড়িত যেকোন ব্যক্তিকে অপসারণের জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাংলাদশকে অবহিত করেছেন ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা

শুধু তাই নয়-কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন স্বাধীন নারী পরিচালক বোর্ডে রাখার নিয়ম থাকলেও সেটি রাখেননি মোঃ নুরুন নেওয়াজ ওরফে সেলিম ও খায়রুল আলম চাকলাদারের এনসিসি ব্যাংকের বোর্ড।