
বিশেষ প্রতিনিধি:
জামানত বাবদ ঠিকাদারদের জমা করা ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করেছেন তিনি। প্রমাণিত এই অপরাধেও কোনো শাস্তি পাননি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বঙ্গভবনে উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আশ্রায়ন প্রকল্পের DPD হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্দনা এবং শেখ হাসিনার গুনকীর্তন করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। ৫ আগষ্টের পর ভোল পাল্টে সুবিধাব আদায় করে নিয়েছেন তোলেন। অপকর্ম ডাকতে নানা ফন্দি ফিকির করার মাস্টারও তিনি। কিভাবে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করতে হয়, এ বিষয়ে সিদ্ধহস্ত, বহুল আলোচিত অনিয়ম দুর্নীতি এবং আমানতের খেয়ানতকারীর হাতেই এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সকল বদলি। বদলি বাণিজ্যে ফুলে ফেঁপে ওঠা এই কর্মকর্তার হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান। গণপূর্ত অধিদপ্তরে সবাই তাকে খুদে দরবেশ হিসেবে ডাকেন। দরবেশের দরবারে অর্থ কড়ি না ঢাললে, কারও বদলির আদেশই ঠিকঠাক থাকে না।
বঙ্গভবনে উপ- বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আশ্রায়ন প্রকল্পের DPD হিসেবে দায়িত্ব পালন করে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। ৫ আগষ্টের পরও প্রািইজ পোস্টিংয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান
এই পদে দায়িত্ব পালন করে প্রতিটি বদলির আদেশে স্বাক্ষর করার আগেই তার টেবিলে ক্যাশ দিতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এভাবেই মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ক্যাশিয়ারের দায়িত্বও পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, দরপত্র মূল্যায়ণ কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রতিটি অনুমোদন থেকে ২ পার্সেন্ট করে কমিশন নেন প্রধান প্রকৌশলী অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তার এই কমিশনের টাকার পুরোটাার হিসাব রাখার দায়িত্ব পালন করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের অধীন কাশিমপুর কারাগার-২ এর এইচটি ক্যাবল ফল্ট লোকেটর মেশিন সরবরাহের অনুকূলে ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার ঠিকাদারের কাছ থেকে জামানত হিসেবে নেন। পরে এই অর্থ লোপাট করার উদ্দেশ্যে পে অর্ডার ক্যাশ করে টাকা তুলে ফেলেন। এরপরর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের ইউনিভার্সেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সত্ত্বাধিকারী মো. আবুল হাশেম এ নিয়ে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটি তদন্ত করে কাশিমপুর কারাগার-২ এর এইচটি ক্যাবল ফল্ট লোকেটর মেশিন সরবরাহের অনুকূলে জামানত বাবদ ঠিকাদারদের জমা করা ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডারটি অবৈধভাবে ক্যাশ করার সত্যতা পায়। তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর মুহাম্মদ সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচারণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। সেই মামলায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অব্যাহতি পান তিনি। এরপর পদোন্নতিও ভাগিয়ে নেন মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী হিসেবে সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
দরপত্র মূল্যায়ণ কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রতিটি অনুমোদন থেকে ২ পার্সেন্ট করে কমিশন নেন প্রধান প্রকৌশলী অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তার এই কমিশনের টাকার পুরোটাার হিসাব রাখার দায়িত্ব পালন করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান।
এই পদে বসেই আবারও বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তিনি। টাকা ছাড়া কোনো ফাইল তার টেবিল থেকে নড়েই না। এমনকি প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর কমিশনের টাকার রাখার ফলে সবাই তাকে চিফের ক্যাশিয়ার হিসেবেই জানেন। বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তরে এখন ওপেনেসিক্রেট।

অভিযোগ অনুযায়ী, সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন এবং বদলী প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে একদিনেই অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলী আদেশ জারি করা হয়, যা প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিশেষ করে এমন কর্মকর্তাদেরও বদলী করা হয়েছে, যারা নির্ধারিত সময় পূর্ণ না করেই কর্মস্থল পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পছন্দের পদে পদায়নের জন্য আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে এবং কিছু কর্মকর্তাকে চাপের মুখে রাখতে ঘনঘন বদলির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে বিষয়টি নজরে এলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেশ কিছু বিতর্কিত বদলী আদেশ স্থগিত করা হয়। দুদক ইতোমধ্যে সারোয়ার জাহানের সম্পদের তথ্য যাচাইয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের সম্ভাব্য বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজ প্রকাশ না করার অনুরোধ করে এই প্রতিনিধিকে ম্যানেজ করার জন্য চেষ্টা চালান। বিকাশ নাম্বার আছে কিনা, জানতে চান।
(আগামী পর্ব: অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন গণপূর্তের সারওয়ার জাহান)


