পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘিরে এখনো তৎপরতার অভিযোগ!

0
629

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনের অগোচরে মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল হকের নেতৃত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও মিশনের কিছু কর্মকর্তা মিলে শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য নীল নকশা বাস্তবায়নের কাজ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্কমকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে এসব গোপন চক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আশির্বাদ পাওয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর বর্তমান মহাপরিচালক (প্রশাসন) আওয়ামী সরকারের আমলে পরিচালক (সংস্থাপন )-এর দায়িত্ব পালন করেছে। তার সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ কর্মরত ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত কর্মকর্তারা এবং আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা সকলকেই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দুতাবাসে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে।

নাজমুল হকের স্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলেও আওয়ামী রাজনীতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। সকল নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে এনথ্রোপলজি বিভাগে ওই বছর যে প্রথম হয় তাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী সুপারিশে তার এ নিয়োগ হয়। এরপর তিনি আওয়ামী প্রভাব বিস্তার করে এবং টক শো তে আওয়ামী বন্দনা করে ৮ বছর ছুটি কাটিয়েছেন।

নাজমুল এর সাথে পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে যোগ দিয়েছেন সবুজ আহমেদ। আওয়ামী পরিবারের সন্তান সবুজ আহমেদ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান-তিনি আওয়ামী সরকারের ২০২৪ সালের সাজানো নির্বাচনে ইলেকশন সেল এর পরিচালক এর দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে সে বিদেশী অনেক সাংবাদিকদের মন্ত্রণালয়ের অনুমুতি ছাড়া বাংলাদেশ এ ঢুকতে ভিসা না দিতে এম্বাসি গুলোকে নির্দেশ দেন যাতে সাজানো নির্বাচন নিয়ে বাইরে আলোচনা না হয়। তাছাড়া সে গত ৬ বছর নিয়ম বহির্ভুতভাবে আংকারা দূতাবাসে ১ম সচিব হিসেবে ছিলেন যার প্রধান কারণ ছিল আংকারা দূতাবাসে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বানানো।

নাজমুল হকের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রের সূচনা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল হক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রদান এবং কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছেন। নাজমুল হক একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হলেও, তাঁর শাসনকালের মধ্যে একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যার মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি গ্রুপের কর্মকাণ্ড এবং তাদের আওয়ামী পন্থী লোকজনদের পদায়নের বিষয়টি অন্যতম।

জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী পন্থী কর্মকর্তাদের পদায়ন করার মাধ্যমে নাজমুল হক ও তাঁর সহযোগীরা দলের স্বার্থে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন পদায়ন: আওয়ামী পন্থী কর্মকর্তাদের নিয়োগ

সূত্রে প্রকাশ, নাজমুল হক এবং তাঁর সহযোগী সবুজ আহমেদ, বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। নাজমুল হক এবং সবুজ আহমেদ পূর্বে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং তাদের নিয়োগের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে একধরনের ‘সমান্তরাল ফোর্স’ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের অগোচরে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার মাধ্যমে জানা গেছে যে, দিল্লি মিশনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তাঁর স্ত্রী সামিয়া ইসরাত রনি পদায়ন পেয়েছেন। তারা উভয়েই ছাত্রজীবনে আওয়ামী লীগ তথা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

তারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাবের মাধ্যমে বিভিন্ন মিশনগুলিতে পদায়ন লাভ করেছেন, এমনকি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পৌঁছেছেন।

বর্তমানে নয়াদিল্লি হাইকমিশনে কারা আছেন? 

ইতোপূর্বে দিল্লী মিশনে ১ম সচিব (রাজনৈতিক) জাহিদ চৌধুরি যোগদান করেন।  এর আগের পোস্টিং তিনি মস্কোতে করেন। আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মূলত তাঁকে মস্কো থেকে দিল্লিতে পদায়ন করা হয় । সমস্ত নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লীতে যোগদান করা জনাব আলমগীর হোসেনকে লিসবন থেকে দিল্লিতে পদায়ন করা হয়। ছাত্রজীবনে তাঁর ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার কারনে তাঁকে দিল্লিতে পদায়ন করতে সরাসরি ওবায়দুল কাদের এর দফতর থেকে নির্দেশনা এসেছিল।

এছাড়া ভারতের চেন্নাই-এ কর্মরত উপ হাইকমিশনার সেলী সালেহিন-এর ৩ বছর হওয়ায় তাঁর বদলি হওয়াটা স্বাভাবিক। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত ভদ্র এ কর্মকর্তা কে চেন্নাই এ পদায়ন করে আওয়ামী বিশেষ ফায়দা হাসিল হয়নি বলেই প্রতীয়মান। তাই  নাজমুল হক তাঁর বদলি করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে নিয়ম মাফিক এ বদলিতে চেন্নাই-এ কাকে পদায়ন করা হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।  শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের সাহায্য করার জন্য চেন্নাই-এ বদলি করে আনা হচ্ছে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক ও মাসুদ বিন মোমেনের পরিচালক আলিমুজ্জামানকে। আলিমুজ্জামান এর পূর্বে রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ এর সাথে  শ্রীলংকাতে ছিলেন। এই কর্মকর্তাকে বার্মিংহাম এ তাঁর তিন বছর পূর্ন হওয়ার আগেই এভাবে বদলি করে নিয়ে আসা হচ্ছে শুধুমাত্র ভারতে অবস্থানরত পালিয়ে থাকা আওয়ামি নেতাদের দেখভাল ও তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য।

বাংলাদেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে আওয়ামী নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ-এর আস্থাভাজন তানভির মনসুরকে উপহাইকমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি ইতপূর্বে আসাম এ বাংলাদেশ হাইকমিশনে সহকারি হাইকমিশনার ছিলেন। একই দেশে পরপর দুইবার পদায়ন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে মনে হয় প্রথম।  তাছাড়া কলকাতা মিশনে এনএসআই এর কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিল। সে এখনো বহাল তবিয়তে সেখানে চাকরি করে যাচ্ছে।

কেন এই পদায়ন?  

ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এইসব কর্মকর্তাদের ভারতে পদায়ন করছে বর্তমান মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল হক। এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে সম্ভবত এমন একজনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হবে যার সাথে আওয়ামীলীগ পরিবারের ভাল সম্পর্ক রয়েছে একই সাথে পদায়িত কর্মকর্তারাও তাঁর কথাতে চলবে। পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন সম্ভবত এইসব পদায়নের বিষয়টি ভাবেননি বা তাঁকে ভূল বুঝানো হয়েছে। যদিও জসীম উদ্দিন নিজেও আওয়ামী সরকারের আমলে পরপর তিনটি দেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং সচিব পদে সবার সাথে পদোন্নতি পেয়েছেন। এমনকি তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জনপ্রশাসন পদক নিয়েছেন। অসাধারণ চাতুর্যের সাথে এর পরিকল্পনাটি করেছে মূলত নাজমুল হক এবং মন্ত্রণালয়ে কর্মরত পরিচালক (প্রশাসন) সবুজ আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অন্যরা।

পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের উচিত এই সব পদায়নের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন ‘সমান্তরাল ফোর্স’ তৈরির পরিকল্পনা বন্ধ করা। বিশেষভাবে, নাজমুল হক এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো উচিত, যাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

এছাড়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাদের পদায়ন করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে একাধিক সিকিউরিটি ভেরিফিকেশন প্রয়োজন। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে যারা কাজ করছেন, তাদের প্রতি সরকারের আরও তীক্ষ্ণ নজর রাখা উচিত।

মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি এসব অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে এটি সরকারের জন্য একটি বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সেই সাথে দেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।